Category Archives: কলাম থেকে নেত্তয়া

এতদিন এই লেখাটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম “সাদাসিধে কথা টিপাইমুখ: একটি প্রতিক্রিয়া”- মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বরাক নদের এই জায়গাতেই প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা ভারতের, পেছনে টিপাইমুখ গ্রাম
১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদের জন্য নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ক্লেটন উইলিয়ামস নামে এক ব্যক্তি। ভদ্রলোক নির্বাচনে জিততে পারেননি, কিন্তু পৃথিবীর অনেক মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে তাঁর একটি উক্তির জন্য। তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণ থেকে যদি রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় না থাকে, তাহলে চেষ্টা করা উচিত সেটা উপভোগ করা। (আমি যা-ই লিখি, ছোট বাচ্চারা নাকি সেটা পড়ে ফেলে—তাই ওপরের কথাগুলো লিখতে খুব খারাপ লাগছে।) ক্লেটন উইলিয়ামসের কথার মতো হুবহু একটা কথা ২৯ ডিসেম্বর ২০১১-এর প্রথম আলোয় পড়েছি। টিপাইমুখ সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ‘ভারত এই বাঁধ তৈরি করবেই, আমাদের কৌশল হওয়া উচিত এ থেকে আমরা কী সুবিধা নিতে পারব সেই চেষ্টা করা।’
এর কিছুদিন আগে গওহর রিজভী পত্রিকায় একটা লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখাটিতে নানা রকম ভণিতা ছিল, দেশ, দেশের স্বার্থ—এই সব বড় বড় কথা ছিল এবং পুরো লেখাটিতে পাঠকদের উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন আবেগের বশবর্তী হয়ে হঠকারী কাজকর্ম শুরু করে না দেয়। গওহর রিজভী সরকারের মানুষ, তাঁর লেখাটি পড়ে আমরা সবাই সরকারের ভূমিকাটা কী হবে, তা আঁচ করতে পেরেছিলাম।
আমি নদী বিশেষজ্ঞ নই, পানি বিশেষজ্ঞ নই, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু আমার গত ৫৯ বছরের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস শিখেছি, সেটা হচ্ছে পৃথিবীর জটিল থেকে জটিলতম বিষয়টিও কমন সেন্স দিয়ে প্রায় ৯০ ভাগ বুঝে ফেলা যায়। কাজেই বাংলাদেশের মানুষ টিপাইমুখের বিষয়টি শতকরা ৯০ ভাগ শুধু কমন সেন্স দিয়ে কিন্তু বুঝে ফেলেছে। বড় বড় বিশেষজ্ঞ কিউসেকের হিসাব, বর্ষা মৌসুম, শুষ্ক মৌসুম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকুন, আমরা সাধারণ মানুষ কিছু সাধারণ প্রশ্ন করি:
আমরা কি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করব? একেবারে ছোট শিশুটিও জানে পৃথিবীতে প্রযুক্তি এখনো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জায়গায় পৌঁছায়নি, কোনো ভূমিকম্প থামানো যায় না, কোনো ঘূর্ণিঝড় বন্ধ করা যায় না, পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ঢল আটকানো যায় না। ঠিক সে রকম একটা নদীকে বন্ধ করা যায় না, গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া যায় না। নির্বোধ মানুষ যে চেষ্টা করে না তা নয়, পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই করা হয়েছে; কিন্তু সেটা মানুষের ওপর অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে। ভবদহের কথা আমরা ভুলিনি, ফারাক্কা আমাদের চোখের সামনেই আছে। কাজেই গওহর রিজভী কিংবা মহিউদ্দিন আহমেদের মতো বিশেষজ্ঞরা যতই বলুন ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাঁধ তৈরি করে’ বাংলাদেশকে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা করে ফেলতে হবে আমি সেই কথা বিশ্বাস করি না। আমাদের দেশে কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে বিশাল এলাকা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অসংখ্য অসহায় আদিবাসী মানুষকে রাতারাতি গৃহহারা করা হয়েছিল। এখন সেই চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশের মানুষ কোনো দিন সেটা হতে দিত না, কোনো সরকারের সেই দুঃসাহস দেখানোর সাহস হতো না।
কাজেই বিশেষজ্ঞরা যতই বলতে থাকুন টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত শুভ উদ্যোগ, আমি সেটা বিশ্বাস করি না। যারা প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আসলে তারা পৃথিবীর ভালো চায় না। তারা বাংলাদেশের মানুষ হোক, ভারত বা চীন যে দেশেরই হোক, তাদের ধিক্কার দিতে হবে। তারা হচ্ছে পৃথিবীর দুর্বৃত্ত।
গওহর রিজভী এবং মহিউদ্দিন আহমেদ দুজনই টিপাইমুখ বাঁধের সুফল নিয়ে ভালো ভালো কথা বলেছেন, তার বেশির ভাগ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা তর্ক-বিতর্ক করতে থাকুন। আমি শুধু একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, সেটা হচ্ছে বন্যা। তাঁরা দুজনেই দাবি করেছেন এই বাঁধ দিয়ে বন্যার প্রকোপ কমানো যাবে। আমি সিলেটে থাকি, আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুরমা নদীর দূরত্ব এক কিলোমিটারও নয়। আমি এখানে ১৭ বছর ধরে আছি, শুধু একবার (২০০৪ সালে) সুরমা নদীর পানি উপচে এসেছিল, আমি তো আর কখনো সুরমা নদীর পানিকে তীর ভেঙে আসতে দেখিনি! হাওর অঞ্চল তো প্রতিবছর পানিতে ডুবে যায়, ডুবে যাওয়ারই কথা, সেটাই হচ্ছে এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। সেটা তো বন্যা নয়। তাহলে তাঁরা কোন বন্যাকে ঠেকানোর কথা বলছেন? যে বন্যার অস্তিত্ব নেই, সেই বন্যার প্রকোপ থামানোর কথা বললে আমরা যদি বিশেষজ্ঞদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাই কেউ আমাকে দোষ দিতে পারবে? এই বন্যা নিয়ে তাঁদের বিশেষজ্ঞ মতামত আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়—ঠিক সে রকম তাঁদের অন্যান্য বিশেষজ্ঞ মতামতও যে অর্থহীন নয়, সেই গ্যারান্টি আমাকে কে দেবে?
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ভারত এই বাঁধ তৈরি করবেই’, তিনি তার বিরোধিতা করতেও রাজি নন। কোনো রকম চেষ্টা না করে পরাজয় স্বীকার করার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধ করার চেষ্টাকে এ মুহূর্তে তাঁর কাছে এবং সম্ভবত আরও অনেকের কাছে খুব কঠিন কাজ মনে হচ্ছে। সারা দেশে টিপাইমুখের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তোলা এই মানুষগুলোর কাছে একটা অযৌক্তিক এবং অসম্ভব কাজ বলে মনে হচ্ছে। কাজেই তাঁরা এর জন্য চেষ্টা করতেও রাজি নন।
তাঁদের সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন এই দেশে গণহত্যা শুরু করেছিল তখন কোনো মানুষ যদি যুক্তিতর্ক দিয়ে বিবেচনা করত তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা একটা পুরোপুরি অবাস্তব বিষয়। মার্চ মাসে শুরু করে মে মাসের মাঝামাঝি পুরো দেশটা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছিল। এখন যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হচ্ছে তারা সেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী অনুচর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো দেশ পাকিস্তানের পক্ষে, পৃথিবীর মুসলমান দেশগুলোও পাকিস্তানের পক্ষে, এক কোটি মানুষ দেশছাড়া, যারা দেশে আছে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে, খুন করে সারা দেশে হাহাকার। দেশের কিছু কম বয়সী ছেলেমেয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়েছে, তাদের হাতে অস্ত্র নেই, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই, পেশাদার বাহিনী বিশৃঙ্খল, যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন তাঁদের মধ্যেও কোন্দল—এ রকম একটা পরিবেশ দিয়ে শুরু করে আমরা স্বাধীন একটা দেশ ছিনিয়ে আনতে পারব সেটা কি কেউ কল্পনা করেছিল? করেনি। কিন্তু তার পরও এই দেশের মানুষ দেশপ্রেমের যুক্তিহীন আবেগকে মূলধন করে এই দেশকে স্বাধীন করে ছেড়েছিল।
কাজেই যাঁরা এই দেশের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাঁরা এই দেশের মানুষের ‘যুক্তিহীন’ আবেগকে খাটো করে দেখবেন না। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, তার সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। টিপাইমুখের বেলায়ও হুবহু একই কথা বলা যায়—দেশের মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা করবেন না, তাদের সঙ্গে সহাবস্থান করুন।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
উৎস- প্রথম আলো

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ — “ব্ল্যাক ফ্রাইডে ” হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ
তারিখ: ০৬-১২-২০১১

শুক্রবার মুসলমানদের জন্য পবিত্র একটি দিন। খ্রিষ্টানদের রোববার, ইহুদিদের শনিবার। সপ্তাহের তিন দিন, তিন ধর্মাবলম্বীরা নিয়ে বসে আছে।
শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিকানরা ‘কালো শুক্রবার’ আবিষ্কার করল? থ্যাংকস গিভিংয়ের রাত থেকেই শুরু এই কালো শুক্রবার। একটি দিনের জন্য কম দামে জিনিসপত্র বিক্রির মহোৎসব। ৪০ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন, যার দাম এক হাজার ডলার, Continue reading

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ” উবাস্তে ইয়ামা” – হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদহুমায়ূন আহমেদ
তারিখ: ০১-১২-২০১১

‘উবাস্তে’র অর্থ ময়লা, ইংরেজিতে গারবেজ। ‘ইয়ামা’ শব্দের অর্থ পর্বত। জাপানি এই শব্দ দুটির অর্থ—যে পর্বতে ময়লা ফেলা হয়। Continue reading

সংসার- হুমায়ন আহমেদ নিউইয়র্ক থেকে {বোনাস -আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে গানটি}

হুমায়ূন আহমেদহুমায়ূন আহমেদ

একজন মানুষ এক জীবনে কতবার ‘সংসার’ করে? বেশির ভাগ মানুষের জন্য একবার। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশি মানুষের জন্য দুবার। প্রথম সংসার জ্বলেপুড়ে যাওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার। আমি, মনে হয়, কথা গুছিয়ে বলতে পারছি না। এখানে ‘সংসার’ মানে বিয়ে করে ঘর বাঁধা বোঝাচ্ছি না। হাঁড়িকুড়ি, বিছানা-বালিশ নিয়ে দিনযাপন বোঝাচ্ছি।

আমার মা অতি অল্প বয়সে বাবার সঙ্গে সংসার করতে এসেছিলেন। বাবার মৃত্যুতে মায়ের সংসার লন্ডভন্ড হয়ে গেল। তিনি তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে ঢাকায় এলেন। নিউমার্কেট থেকে হাঁড়িকুড়ি কিনে নতুন সংসার শুরু করলেন। আমি বাবাশূন্য মায়ের নতুন সংসারে যুক্ত হলাম।

পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় গেলাম। গুলতেকিনকে নিয়ে শুরু হলো তৃতীয় সংসার। হাঁড়িপাতিল কেনা, বিছানা-বালিশ কেনা।

ঢাকায় ফিরে এসেই সেই সংসারও ভাঙল। উত্তরার এক বাসায় শুরু হলো আমার একার চতুর্থ সংসার।

বছর তিনেক পর শাওন আমার সঙ্গে যুক্ত হলো। ‘দখিন হাওয়া’য় আমার পঞ্চম সংসার।

ক্যানসার বাধিয়ে আমেরিকায় এসে শুরু হলো ষষ্ঠ সংসার।

সম্ভবত, সপ্তম সংসার হবে আমার শেষ সংসার। সেখানে কি আমি একা থাকব, নাকি সুখ-দুঃখের সব সাথিই থাকবে?

দার্শনিক কথাবার্তা থাক, ষষ্ঠ সংসার নিয়ে বলি।

বাড়ি ভাড়া করা হলো, হাঁড়ি-পাতিল কেনা হলো; টিভি কেনা, বিছানা-বালিশ—সে এক হইচই।

তিন রুমের একটি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। বাড়িটা নিশ্চয় সুন্দর। কারণ, কথাবার্তার একপর্যায়ে বাড়িতে রোগী দেখতে আসা প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বাড়িটা কার?’

আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, ‘যেহেতু ভাড়া নিয়েছি, আপাতত আমার।’

বাড়িটায় তিনটা শোবার ঘর। জানালার পাশে প্রকাণ্ড মেপলগাছ। মেপলগাছের পাতায় ফল-এর (Fall) রং ধরতে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে তাকালে চোখ ঘরে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমেরিকান ইনডিপেনডেন্ট বাড়িতে ‘এটিক’ নামের একটা ছাদঘর থাকে। এই ঘরটা হয় সবচেয়ে সুন্দর। অনেকখানি সময় আমি এটিতে একা কাটাই। লেখালেখি করি না। ছবি আঁকি। জলরং ছবি। ছবি মোটেই ভালো হচ্ছে না। রঙে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। শুধু অন্যদিন-এর মাজহার বলছে, ‘অসাধারণ! আপনার আঁকা ছবি বিক্রি করে আমরা চিকিৎসার খরচ তুলে ফেলতে পারব, ইনশাল্লাহ।’

চিকিৎসার খরচ নিয়ে আমি এই মুহূর্তে ভাবছি না। নিজেকে ব্যস্ত কীভাবে রাখা যায়, ভাবছি তা নিয়ে।

প্রচুর বই জোগাড় করেছি (অর্থাৎ, কিনেছি)। বাড়ির পাশেই একটা পাবলিক লাইব্রেরি, তার মেম্বার হয়েছি। মেম্বার হতে গিয়ে গোপন আনন্দও পেলাম। বিদেশি লেখকদের বইয়ের তাকে দেখি আমার অনেক বই। বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম, ‘বাংলা ভাষার এই বই তোমরা কীভাবে পেয়েছ?’ লাইব্রেরিয়ান বলল, ‘আমাদের বই দেয় লাইব্রেরি অব কংগ্রেস।’

আমি বললাম, ‘বাংলা ভাষার এই লেখক আমার প্রিয় লেখকদের একজন।’ লাইব্রেরিয়ান বলল, ‘হাউ নাইস! তুমি তার একটা বই ইস্যু করে নিয়ে যাও। সাত দিন রাখতে পারবে।’

আমি হিমুর একটা বই ইস্যু করে নিয়ে এলাম।

দেশে যখন ছিলাম, নিয়মিত সাপ্তাহিক টাইম পড়তাম। এখন পয়সা দিয়ে চারটি পত্রিকার গ্রাহক হয়েছি—

Time

Science

Scientific American

National Geographic

অন্য সময় হলে শাওন মাসে মাসে এতগুলো টাকা খরচ করতে দিত না। তার এখন হিসাবের টাকা। গুনে গুনে খরচ করতে হচ্ছে। সে ঠিক করেছে, আমার কোনো কিছুতেই বাধা দেবে না। বিশাল বাড়িতে আমাদের সঙ্গে মাজহার ছাড়া কেউ নেই। কাজেই জলি ও তার স্বামীকে নাইওর নিয়ে এসেছি। রান্নার দায়িত্ব জলি নিয়ে নিয়েছে। সে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ‘হুমায়ূন ভাই, আজ কী খাবেন?’ আমি চেষ্টা করি এমন কোনো খাবারের নাম করতে, যা জোগাড় করা অসম্ভব। কিন্তু অবাক কাণ্ড, খাবারের টেবিলে তা পাচ্ছি। উদাহরণ—

কচুর লতি দিয়ে কাঁঠালবিচি

গরুর ভুঁড়ি

মাছ দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল

ডাঁটা দিয়ে ট্যাংরা মাছ।

মাজহার দায়িত্ব নিয়েছে আমাকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর। অদ্ভুত, উদ্ভট ও অখাদ্য সব ফল ও ফলের রস আমাকে নিয়মিত খেতে হচ্ছে। অসংখ্য বিভিন্ন ধরনের ফল খেয়ে আমি এখন বুঝেছি—জগতে ফলের রাজা আম। ফলের রানি আম। ফলের রাজপুত্র-রাজকন্যা আম।

দেশে আমি ‘গর্তজীবী’ ছিলাম। আমেরিকায় এসে গর্ত থেকে বের হয়েছি। যতটা পারি, পৃথিবী দেখে যাই। কিছুই তো বলা যাচ্ছে না।

গর্ত থেকে বের হয়ে আমি কিছুটা সময় আমার বাড়ির পেছনের ব্যাক ইয়ার্ডে (Back Yard) কাটাই।

আমেরিকানরা এই জায়গাটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে। উইকএন্ডে বারবিকিউ করে, আড্ডা দেয়, বিয়ার খেয়ে উল্লাস করে। বাকি দিনগুলোতে জায়গাটা পড়ে থাকে অনাথের মতো। আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন সন্ধ্যার কিছুটা সময় এখানে কাটাতে।

এক সন্ধ্যায় পুত্র নিষাদকে নিয়ে বসেছি। হঠাৎ পুত্র আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘বাবা, দেখো, বাংলাদেশের চাঁদটা এখানে চলে এসেছে। আকাশে কত বড় চাঁদ!’ তাকিয়ে দেখি, মেপলগাছের ফাঁকে নিউইয়র্ক নগরে সম্পূর্ণ বেমানান এক চাঁদ নির্লজ্জের মতো উঠে বসে আছে। তার তো থাকার কথা বাঁশবাগানে মাথায়।

আমি পুত্রকে বললাম, ‘বাংলাদেশের চাঁদ এখানে কীভাবে চলে এসেছে?’ সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমরা যখন প্লেনে করে এসেছি, তখন প্লেনের পেছনে পেছনে চলে এসেছে। চাঁদটা তোমাকে খুব ভালোবাসে তো, এই জন্য এসেছে।’

শিশুরা না বুঝে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে আমার মনে হলো, আমার পুত্রের কথা সত্যি। বাংলাদেশের দুঃখী চাঁদ শুধু আমাকে ভালোবেসেই কংক্রিটের নিউইয়র্ক নগরে চলে এসেছে।

আমি আমার লেখকজীবনে একটিমাত্র উপন্যাসই আমেরিকায় বসে লিখেছিলাম—সবাই গেছে বনে। নামটা ধার করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান থেকে—‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’।

আচ্ছা, পাঠক কি জানেন, এই গানটি কোনো আনন্দগীতি, না দুঃখগীতি? রবীন্দ্রনাথের অতি আদরের পুত্র শমির মৃত্যুর পরদিন রাতে আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছিল। রবীন্দ্রনাথ একা টানাবারান্দায় বসে প্রবল জোছনার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লিখলেন—

‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

বসন্তের এই মাতাল সমীরণে\

যাব না গো যাব না যে

রইনু পড়ে ঘরের মাঝে—

এই নিরালায় রব আপন কোণে।…

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে

ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।

আমারে যে জাগতে হবে

কী জানি সে আসবে কবে

যদি আমায় পড়ে তাহার মনে…’

গানটি আমাও খুব প্রিয়।প্রায়ই রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। আর তখন মোবইলে এই গানটি শুনি……শুনতে শুনতে আমার কল্পনায় যেন হারিয়ে যাই কোন এক গ্রামের জোছনার রাতের আবহাওয়ায়…..সত্যি সেই ফিলিংসিংটা অসাধারন……যা আমি বলে বুঝাতে পারব না।কোন একদিন গভীর রাতে যখন চারপাশে অন্ধকার। চাঁদের আলো হালকা হালকা দেখা যাচ্ছে, একধুম নি:শব্দ রাত তখন শুনে দেখবেন এই গান…….

সহায়ক: উৎসএক

আমি তাহারে খুজিয়া বেড়াই….. একজন স্টীভ জবস………A – Z ….

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম আনুমানিক ৫.৪৫ কিংবা ৬টার দিকে। রাতে বেলা ঘুমাতে পারি নাই। মনে আছে রাতে ৩.২০ পযন্ত জেগে ছিলাম। স্বভাবমত ভেবেছিলাম আজও সকালে উঠতে আমার অনেক দেরি হবে। কিন্তু ভাগীনাদের যন্তনায় আর তা হলে না। সকাল হতে না হতে ওরা জেগে উঠে এবং দুইজনই আমার পিঠের উপর উঠে  বলতে থাকবে গেমস গেমস…..ভাসির্টি ……গেমস খেলব…………কি আর করা। মামা বাড়িতে এসেছে পরীক্ষা শেষ করে  এখন ওদের আবদার তো রাখতেই হবে। ঘুম ঘুম চোখে ওদের জন্য পিসি ওপেন করলাম। ওদের কাছে জানতে চাইলাম কি গেমস খেলবি, দুইজন একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল ভার্সিটি…….gta….. এই  গেমস জিনিসটা আমি খুব একটা খেলথে পারি না। টানা ৫ মিনিট খেললেই আমার মাথা প্রচন্ড ধরে যায়। তাই গেম খেলা ছেড়ে দিয়েছি…তবে মাঝে মাঝে যে খেলি না তা না…….কিন্তু ব্যাপারটা আর আগের মত নেশা পর্যায়ে নাই। গেমস ওপেন করার আগে আমি  ফেইসবুকে একটু টু মারালাম মেইল চেক করার জন্য। প্রথম ঢুকেই দেখি হোম পেইজে আমাদের জুকবার.. লিখেছে Mark Zuckerberg Steve, thank you for being a mentor and a friend. Thanks for showing that what you build can change the world. I will miss you. ফেইসবুকের নতুন ফিচার Subscriptions ( এর কারনেই অণেক বিখ্যাত ব্যাক্তির স্ট্যাটাস পড়তে পারছি এর জণ্য ফেইসবুককে ধন্যবাদ…………… এই স্ট্যাটাসটা দেখে বুঝতে পারলাম না……..আসলে ব্যাপারটা কি হচ্ছে। আমার অনেকগুলো বন্ধুর স্ট্যাটাস দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না স্টিভ জবস আর নেই :’( সাথে সাথে গেলাম apple এর ওয়েবসাইটে সেখানে  দেখে আমি পুরোপুরি নিশ্চত হলাম………….:’( সত্যি আমার নিজের যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না……………….. কিছুক্ষন মনে করার চেষ্টা করলাম। আজ কি এপ্রিল ফুল কি না। নাকি আইফোন ৫ এর কোন প্রচারনা চালাছে………….. ভাগীনাদের গেমস খেলতে দিয়ে চলে আসলাম। মাথার মধ্যে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে…ব্যাপারটা……… কিছক্ষন পর যখন বিস্তারিত খরব বিভিন্ন  সাইট থেকে জানতে শুরু করলাম তখন সত্যি নিজের ভীষন খারাপ লাগছিল………..আর প্রিয় একজমন মানুষ চলে গেল……….:( আমার এই ধরনের ফাউল প্যাচাল শুনে নিশ্চয় সবাই অণেক বিরক্ত হলে গেলেন তাই না। দেখি স্টিভ সম্পকে কিছু তথ্য। আগেই বলে রাখি সবগুলোই কপি করা। কেউ আমার কপি করেছি এই মামলা করে দেইয়েন না। কারন স্টিভ জবসকে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে চিনি না। ত্তনার সম্পকে যতটুকু জেনেছি বিভিন্ন জার্নাল ব্লগ নিউজ পড়ে।  তাই আমার তথ্যের উৎস এতটুকুই……. প্রথমে যেকোন কিছু জানার জন্য আমি  বাংলা উইকিপিডিয়া দেখি। সেখানে না পেলে ইংশিল উইকিপিডিয়ার দেখি। বাংলা উইকিপিডিয়ার স্টিভ জবস সম্পকে যা দেখতে পেলাম তা তুলে দিচ্ছি প্রথমে। এটা থেকে একটু হলেও জানা যাবে কে এই ব্যাক্তি……….. ” স্টিভ জবস (পুরোনাম: স্টিভেন পল জবস) (ইংরেজিতে:Steven Paul “Steve” Jobs) (জন্ম ফেব্রুয়ারি ২৪১৯৫৫, মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০১১) যুক্তরাষ্ট্রের একজন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবক। তিনি অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এছাড়াও তিনি কম্পিউটার ও মনোরঞ্জন শিল্পে একজন বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। জবস, পিক্সার এ্যানিমেশন স্টডিওস-এর সাবেক সিইও। তিনি স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েন-এর সাখে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে টয় স্টোরি নামের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন।“আগেই বলে নিচ্ছি লেখাটি কিন্তু অনেক বড়………তাহলে শুরু করি…

প্রথমে সবাইকে বলল স্টীভ এর এই বক্তিতাটি পড়ার জন্য-

এই লেখাটাযে আমি কতবার পড়েছি তার হিসাব নেই।বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। বক্তব্যটি অনেক আগের। তবে আমার জীবনে শোনা সবচাইতে মুগ্ধকর আর উৎসাহমূলক বক্তব্য। ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন বক্ত্যবটির বাংলা অনুবাদ… প্রথমেই একটা সত্য কথা বলে নিই। আমি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় পাস করিনি। তাই সমাবর্তন জিনিসটাতেও আমার কখনো কোনো দিন উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এর চেয়ে বড় সত্য কথা হলো, আজকেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছে থেকে দেখছি আমি। তাই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। কোনো কথার ফুলঝুরি নয় আজ, স্রেফ তিনটা গল্প বলব আমি তোমাদের। এর বাইরে কিছু নয়। আমার প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন বিন্দুকে এক সুতায় বেঁধে ফেলার গল্প।

steve-jobs-ceo-apple-nextস্টিভ জবস– অ্যাপেল কম্পিউটারের প্রতিষ্ঠাতা

ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মাথাতেই রিড কলেজে পড়ালেখায় ক্ষ্যান্ত দিই আমি। যদিও এর পরও সেখানে আমি প্রায় দেড় বছর ছিলাম, কিন্তু সেটাকে পড়ালেখা নিয়ে থাকা বলে না। আচ্ছা, কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লাম? এর শুরু আসলে আমার জন্মেরও আগে। আমার আসল মা ছিলেন একজন অবিবাহিত তরুণী। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

Continue reading

সাক্ষা ৎকার-হুমায়ূন আহমেদ —- ‘মৃত্যু নিয়ে প্রায়ই ভাবি’—

কোন ভূমিকা লিখতে ইচ্ছা করছে না।ইচ্ছা করলেত্ত লিখতে পারব না। লিখার জন্য মোডের খুব্ই প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এখন সেই মোড নেই। সাক্ষাৎকারটি। জানি ভাল লাগবে।আর এই কামনা করি আল্লাহ যেন আর খুব প্রিয় একজন লেখক “এই মানুষটি “কে সুস্থ করে দেয়।

 

 

এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। চিকি ৎসার জন্য নিউইয়র্কের পথে রওনা হওয়ার দুই দিন আগে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেনছুটির দিনের। সাক্ষা ৎকার নিয়েছেন আলীম আজিজ ও ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’র ফ্ল্যাটবাড়ির দরজাটা হাট করে খোলা। আমরা আসব বলে নয়, গৃহকর্তা ঘরের দরজা সব সময় উন্মুক্ত রাখতে চান বলে। বসার ঘরে বসি। দেয়ালে ঝোলানো পূর্ণেন্দু পত্রী আর এস এম সুলতানের চিত্রকর্মে চোখ বোলাতে বোলাতেই গৃহকর্তা হুমায়ূন আহমেদ চলে আসেন আমাদের মাঝে। গায়ে সবুজরঙা বাটিকের পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।  Continue reading

যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ— হুমায়ূন আহমেদ

আমার কলাম পড়ার একটা সুঅভ্যাস আছে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু কলাম অণেক ভাল লেগে যায় আর সেই সব কলাম গুলো নিজের সংগ্রহে রাখার জন্য ব্লগে কলাম নামে একটা বিভাগ খুলেছে। প্রিয় কলামগুলো লিংকসহ কপি করে রাখি। আজ হুমায়ন আহমেদ এই লেখাটি ভাল লাগল……………

যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ—  হুমায়ূন আহমেদ

[এখানে যে যোগাযোগমন্ত্রীর গল্প বলা হচ্ছে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা এরশাদ আমলের মন্ত্রী নন। অন্য কোনো আমলের। তবে আনন্দের বিষয়, সব আমলের জিনিস একই। —লেখক]

যোগাযোগমন্ত্রী সালাহউদ্দিন খান ভুলু সাহেবের দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমানোর অভ্যাস। মন্ত্রীর কঠিন দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি এই অভ্যাস বহাল রেখেছেন। একটু উনিশ-বিশ অবশ্য হচ্ছে; আগে ঘুমানোর সময় একজন গায়ের ঘামাচি মেরে দিত, এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায়ই ভাবেন, পলিটিক্যাল পিএসকে ঘামাচি মারতে বলবেন। সে আগ্রহ নিয়ে কাজটা করবে। একটাই ভয়, কোনো পত্রিকায় যদি নিউজ চলে যায়! পত্রিকাগুলো চলে গেছে দুষ্টুদের দখলে। তারা সম্মানিত মন্ত্রীদের ওপর টেলিস্কোপ ফিট করে রেখেছে। আরাম করে ১০ মিনিট ঘুমানোর উপায়ও নেই।

সালাহউদ্দিন খান ভুলু দিবানিদ্রা সেরে উঠেছেন। মন-মেজাজ এখনো ধাতস্থ হয়নি। তিনি কয়েকবার হাই তুললেন। এই সময় তাঁর পিএস (সরকারি) ঢুকলেন। বিনীত গলায় বললেন, স্যারের ঘুম ভালো হয়েছে?

মন্ত্রী বললেন, আমি আপনাকে অনেকবার বলেছি, দুপুরে আমি ঘুমাই না। চোখ বন্ধ করে একধরনের যোগব্যায়াম করি। ‘শবাসন’ এই ব্যায়ামের নাম। এতে টেনশন কমে।

পিএস বললেন, স্যার, সরি। আমি যোগব্যায়ামের ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। আপনার নাক ডাকার শব্দে বিভ্রান্ত হয়েছি।

আর বিভ্রান্ত হবেন না। নাক ডাকা না। দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ফেলা যোগব্যায়ামেরই অংশ। আমার নাকে পলিপ আছে বলে দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় নাক ডাকার মতো শব্দ হয়। এখন ক্লিয়ার হয়েছে?

অবশ্যই, স্যার।

কোনো কাজে এসেছেন?

একটা রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মাইক্রোবাস ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে। পাঁচজন মারা গেছে।

অ্যাকসিডেন্ট হলে মানুষ মারা যাবে, এটা নতুন কী? এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছেন?

অনেকেই আপনাকে দুষছে। রাস্তাঘাট ভাঙা, খানাখন্দে ভরা। এই কারণেই অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে।

এটা কী মাস?

ভাদ্র মাসের শুরু।

বৃষ্টি হচ্ছে না?

রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।

এই বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ঠিক থাকে?

থাকে না, স্যার।

বাস্তবতা বুঝতে হবে। তুচ্ছ বিষয়ে মন্ত্রীকে দুষলে হবে না। বুঝেছেন?

জি স্যার।

খরা মৌসুম আসুক, রাস্তাঘাট ঠিক হবে।

সাংবাদিকেরা আপনার কাছ থেকে শুনতে চায়।

শুনতে চাইলেই আমি শোনাব না। আপনি বলে দিন, গতবারের সরকারের যোগাযোগ খাতে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে রাস্তাঘাটের আজ এমন বেহাল দশা। একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দিন।

জি স্যার। স্টেটমেন্টের ব্যবস্থা করছি। তবে আপনাকে একটু কষ্ট করে হাসপাতালে যেতে হবে।

কেন?

মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় কিছু বিখ্যাত মানুষ মারা গেছেন। যাঁরা আহত, তাঁদের দেখতে যাওয়া উচিত।

বিখ্যাত মানুষ কে মারা গেল?

পিএস বিখ্যাত মানুষদের তালিকা বললেন।

মন্ত্রী বিরক্ত গলায় বললেন, এরা বিখ্যাত হলো কবে? আমি তো নামও শুনি নাই। মিডিয়া এদের বিখ্যাত বানিয়েছে। সব মিডিয়ার কারসাজি। দেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে মিডিয়া।

যথার্থ বলেছেন। তবে মিডিয়াকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।

হাসপাতালে গিয়ে কী বলব, ঠিক করে এনেছেন? উল্টাপাল্টা কিছু বলে ফেলতে পারি। মুডি মানুষ তো, মুডের ওপর চলি।

পিএস বললেন, আমি দুই ধরনের বক্তব্য তৈরি করে এনেছি, যেটা আপনার পছন্দ। আপনি বলবেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের কী করার আছে?

মন্ত্রী বললেন, ভালো বক্তব্য। আল্লাহর ওপর কোনো কথা নেই। ধর্মভিত্তিক দল আমার এই বক্তব্য পছন্দ করবে।

অথবা আপনি বলবেন, মাইক্রোবাসের চালকের অদক্ষতাই দুর্ঘটনার কারণ। সে ওভারটেক করতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে দোষটা ওদের ঘাড়ে গিয়েই পড়বে।

মন্ত্রী বললেন, এটাও খারাপ না। আমি বরং দুটো একত্র করে বলি। প্রথম বলি, মাইক্রোবাস চালকের ভুল। তারপর বলি, আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়েছে। বুদ্ধিটা কেমন বের করেছি?

অসাধারণ। আপনার চিন্তাধারাই বৈপ্লবিক।

আমাদের এই মুডি মন্ত্রী নানা ধরনের কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। মিডিয়া তাঁকে নিয়ে কিছু কাজকর্ম করল। মন্ত্রী যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তার বেহাল দশা দেখতে গেলেন, তখন বদগুলো তাঁর হাসিমুখের ছবি ছাপাল। রাস্তায় বিশাল এক গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাসছেন—এ রকম ছবি। এই অপরাধ ক্ষমা করা যায়, কিন্তু তাঁর পদত্যাগ চেয়ে প্রতিবেদন ক্ষমা করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছে? মন্ত্রীরা হলেন কচ্ছপ। কচ্ছপের মতো কামড় দিয়ে তাঁরা মন্ত্রিত্ব ধরে রাখবেন। এটাই নিয়ম।

মন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক সচিবের পরামর্শে কিছু জটিল পদক্ষেপ নিয়ে নিলেন। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। একটা ছোট্ট সমস্যা তাতে হলো; দেখা গেল, সবাই দুর্নীতিবাজ। রসুনের বোঁটা অবস্থা। একজনকে শাস্তি দিলে বাকিরা খেপে যাবে। ওদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। কাজেই অনেক ঝামেলা করে একজন সৎ কর্মচারী খুঁজে তাঁকে বরখাস্ত করা হলো।

মন্ত্রী মহোদয় সব পত্রিকায় তাঁর একটি ছবি পাঠালেন। সেই ছবিতে তিনি কোদাল হাতে ভাঙা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো। নিচে লেখা, ‘মন্ত্রী মহোদয় নিজেই রাস্তা মেরামতে নেমে পড়েছেন’।

কোনো পত্রিকা এই ছবি ছাপাল না, উল্টো এক বদ পত্রিকা এই ছবি নিয়ে কার্টুন বানিয়ে ছাপিয়ে ফেলল। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, রাক্ষস টাইপ চেহারার এক লোক খালি গায়ে খাকি হাফপ্যান্ট পরে বেলচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ের এবং পায়ের বড় বড় লোম দেখা যাচ্ছে। কার্টুনের নিচে লেখা, ‘যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, আমি একাই ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করব, ইনশাআল্লাহ।’

মন্ত্রী তাঁর পিএসকে ডেকে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, তিন কোটি টাকার একটা মানহানি মামলার ব্যবস্থা করুন। আমার ছবি বিকৃত করে ছেপে আমার মানহানি করেছে।

পিএস বললেন, বিকৃত করে তো ছাপে নাই, স্যার। কার্টুনে আপনাকে চেনা যায়।

আমাকে চেনা যায়?

জি স্যার।

আমার গা-ভর্তি লোম?

লোমের পয়েন্টে মামলা করতে পারেন। তবে এখন নতুন ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না। এরপর এরা নিউজ করে দেবে—কার্টুন ছবিতে মন্ত্রীর গায়ের লোম দেখানোয় এক কোটি টাকার মানহানির মামলা।

এক সকালবেলার কথা। মন্ত্রীর স্ত্রী সালমা বানু (বিশিষ্ট সমাজসেবী, পরিবেশ রক্ষাকর্মী, বিপন্ন হনুমান বাঁচাও আন্দোলনের সভানেত্রী) তাঁর স্বামীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে তীক্ষ গলায় বললেন, আমাকে না জানিয়ে, আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে তুমি কী করে এই কাজ করলে?

মন্ত্রী বললেন, কী কাজ করলাম?

পদত্যাগ করেছ, আমাকে না জানিয়ে।

পদত্যাগ করব কোন দুঃখে?

পত্রিকায় নিউজ এসেছে। এই দেখো।

মন্ত্রী মহোদয় হতভম্ব হয়ে পড়লেন, ‘যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী মহোদয় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।’

হতভম্ব মন্ত্রী তাঁর পিএসকে টেলিফোন করলেন। অনেকবার রিং হলো, পিএস ধরলেন না। তিনিও নিউজ পড়েছেন। এখন যে মন্ত্রী নন তাঁর টেলিফোন কেন ধরবেন! আমজনতার টেলিফোন ধরার কিছু নেই।

মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পিএসকে টেলিফোন করলেন। পিএস তাঁর কোনো কথা না শুনেই বললেন, পদত্যাগ করে ভালো করেছেন। দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আচ্ছা রাখি।

মন্ত্রী লাইন কেটে দেওয়ার পর অনেকবার চেষ্টা করলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব টেলিফোন ধরলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি লক্ষ করলেন, পত্রিকার এই বানোয়াট খবর সবাই বিশ্বাস করে বসে আছে। তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর সিগারেট ফুঁকছিল, তাঁকে দেখে সিগারেট ফেলে না দিয়ে শুধু পেছনে আড়াল করল।

মন্ত্রী মহোদয় প্রধানমন্ত্রীকে ধরার অনেক চেষ্টা করলেন। তাঁর চেষ্টা দেখতে পেলে রবার্ট ব্রুসও লজ্জা পেত। একসময় চেষ্টা সফল হলো। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন ধরলেন এবং বললেন, আপনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। মন্ত্রী না থেকেও জনগণের সেবা করা যায়। জনগণের সেবা করুন।

প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন রেখে দিলেন।

[গল্পের মোরাল: মন্ত্রীদের বুকে এবং পায়ে লোম না থাকা বাঞ্ছনীয়।]

সহায়ক:

উৎস১

মন্টুর ফাঁসি- হুমায়ন আহমেদের এর কলাম……..

কয়েক লাইন লেখায় হুমায়ন আহমেদ কত সুন্দর করে একটা চরম সত্য তুলে ধরলেন………..।

আমিত্ত এই দুটির প্রশ্নের উত্তর শুনতে চাই। যখন প্রথমে এই নিউজটি পড়লাম যে খুনির আসামীকে ক্ষমা করে দিয়েছে তখন অণেক মেজাজ খারাপ হল। দেশ কি এদের বাড়ির মত। যে যা ইচ্ছা করবে। রাজনীতি প্যাচাল আমার ভাল লাগে না। সব সময়ই রাজনীতি ব্যাপারটা আমার কাজে বিরক্ত লাগে। তাই এই নিয়ে প্যাচাল পারব না।

Continue reading